নদীর তীরের ফুরফুরে হাওয়া ও খাদ্য বিলাস

 

 

লকডাউন উঠে গেছে। সবার ছিলো খাঁচায় বন্দি হওয়া বানরের মতো জীবন-যাপন। লাফ-ঝাঁপ যাই করো, তা ওই চার দেওয়ালের ভিতর। বড়ো জোর ছিল গলির মুখের মুদির দোকান বা বড় রাস্তার পাশের সুপার-শপ পর্যন্ত খানিকটা স্বাধীনতা। খানিকটা উওেজনা অবশ্য ছিলো- পুলিশের সাথে চোর-পুলিশ খেলা। সে এক পুরানো খেলা। দোকানপাট সবই খোলা, কিন্তুু দুর থেকে পুলিশের গাড়ি দেখলেই ঝটা-পট সার্টার নামিয়ে ফেলা। দোকানের ভিতর আটকে পড়ে গেলো কাষ্টমার ও দোকানদার। পুলিশের গাড়ির সাইরেন-দোকানের ভিতর বুক ধরফোঁড় করছে সবার। আচমকা শীষ দিলো বাইরে থেকে কেউ। যা, বাবা, পুলিশ চলে গেছে। দোকানপাট খুলো রে । বিষন্ন মুখে বাড়ি ফেরা, বউ,ছেলে-মেয়ের বোরিং চেহারা ( চেনা মানুষের চেহারা সারাদিন দেখলে বোর হওয়ারই কথা) ,টিভির সামনে অখাদ্যসম হিন্দি সিরিয়াল দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া । ঘুম থেকে উঠে পাড়ার মোড়ে যেয়ে লকডাইন কেমন হচেছ তা একটু অবলোকন করা,খানিকটা আড্ডাবাজী-মোটামুটি এই ছিলো আমাদের লকডাউনের জীবনধারা। 


 

তাই লকডাউন যখন উঠে গেলো, আমাদের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। সবার মুখ হাসি হাসি। আহা কি আনন্দ আকাশে-বাতাসে! আমাদের মধ্যে (বিশেষ করে আমার মধ্যে) লুকিয়ে থাকা ভ্রমণ-পিয়াসী বেহায়া মনটা নেচে উঠলো। এবার মুক্ত বাতাস চাই, দিগন্তে মিশে যাওয়া সুনীল আকাশটা হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আবারও প্রাণ ভরে দেখবো সবুজ গাছের পাতার সাথে সোনা-রোদের মাখামাখি। বউ আর দুই মেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এবার গন্তব্য মুন্সিগন্জ। আমার শ্বশুরবাড়ী। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি প্রয়াত হয়েছেন অনেকদিন আগেই। আমাদের গন্তব্য মুন্সিগন্জ শহরের সদররোড়ের খান ভবন। সেখানে আমার একমাত্র শ্যালিকা থাকে কর্মসূত্রে। 

ভ্রমণের সময় আমি এখন খানিকটা বিলাসীতা করি।  ছাত্র জীবনে ভ্রমণে বিলাসিতা প্রশয় পেতো না। হাতে কিছু টাকা পয়সা (বেশীর ভাগ সময়  বাবার কাছ থেকে  এক সপ্তাহ ধরে ঘ্যানর ঘ্যানর করে প্রাপ্ত অর্থ)এলে বেড়িয়ে পড়তাম। যাতায়াতে প্রচুর কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। সস্তা হোটেলে রাত্রিযাপন, ছাঁরপোকার কামড়,হোটেলের পাশের খাবারের দোকানের ডাল-ভাত। সবকষ্ট উবে গেছে যখন দুচোখ ভরে দেখেছি রাঙামাটির কাপ্তাই লেকের অর্পূব সৌন্দর্য, পাহাড়ের কোলে হেলান দেওয়া আকাশ ও মেঘের মিতালী। কক্রবাজারের দীর্ঘতম সমুদ্রের সোনালী বেলাভূমি। অসম্ভব ভালো লাগা সেইসব দুরন্ত দিনগুলো এখনো আমাকে স্মৃতি রসে জারিত করে।

 


২৬ শে আগষ্ট ২০২১ । সকাল ১০.৩০।  মিরপুর ১১.৫ থেকে উবারের গাড়ি ভাড়া করলাম নারায়ণগন্জের সাইনবোর্ড পর্যন্ত। ভাড়া ১১৪০ টাকা। গাড়ির বাইরে ব্যস্ত ঢাকা শহর ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে পুড়ছে। এসির ঠান্ডা হাওয়ার জন্য শরীর মহাশয় শীতল। ট্যাকনিক্যাল মোড় পার হয়ে গাড়ি এগিয়ে চললো পুরানো ঢাকার চাঁনখারপুলের দিকে। যানজটের তেমন দেখা পেলাম না। চাঁনখারপুলে এসে গাড়ি উঠে গেলো মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে। ফ্লাইওভারে উঠার একটু আগে শেখ মুজিব বার্ণ ও প্লাষ্টিক সার্জারী হাসপাতােলের সীমানা দেয়ালের বাইরে ফুটপাতে একটি অতি পরিচিত দুশ্য অবলোকন করলাম। সেই একই প্লার্টফম, একই অভিনেতারা দৃশ্যায়ণ করছেে একটি দৃশ্য। প্যাথেডিন সেবন। এক বয়স্ক লোক কাপড়র ব্যাগ থেকে সিরিন্জ বের করেছে, আর নেশাকারী লুংগি মালকোচা মেরে উঠবোস করছে। বয়স্ক লোকটি টিপে টিপে রক্তের শিরা খুঁজছে। বোঝেন ঠ্যালা ! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা কালে  এই দৃশ্য দেখে দেখে চোখ পচে গিয়েছিলো। তাই আমার কোন ভাবান্তর নেই। আমার ওয়াইফের কাছ দৃশ্যটা নতুন। তাকে ভীষন অবাক ও ব্যাথিত মনে হলো। 

 


 

সাইনবোর্ড এসে গাড়ি ছেড়ে দিলাম। গাড়িতে এসির ঠান্ডা বাতাসে বেশ খানিকটা ঝিমুনী এসেছিল,গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে ভ্যাপসা গরম। সূর্য ঠিক মাথার উপর।একটা সিএনজি রিজার্ভ করলাম। সাইনবোর্ড থেকে মুন্সিগন্জ সদররোড-ভাড়া ৫০০ টাকা। সিনজি চললে একটু আরাম লাগে, যানজটে পড়লেই একে বারে ঘেমে কাহিল। সিনজি নারায়ণগন্জ-এর নিতাইগন্জ এলাকা অতিক্রম করলো। এদিকে বেশ কয়েকটি আটা-ময়দার মিল আছে। শ্রমিকরা ট্রাকে ময়দার বস্তা লোড করছে। বাতাসে ময়দার গন্ধ।  নিতাইগন্জে এলে আমার একা গান মনে পড়ে।

‘ ঘুমাইয়া ছিলাম, ছিলাম ভালো ,জেগে দেখি বেলা নােই । 

কোন বা পথে নিতাইগন্জও যাই...ও বন্ধুরে,,,।’

এটা কি গানের সেই নিতাইগন্জ ? জানি না। মুক্তারপুর ব্রীজ অতিক্রম করে এলাম। আগে ব্রীজ ছিলো না। দুটো কি তিনটে ফেরী ছিল। ফেরীর জন্য অপেক্ষা করতে হয় না আর। বেলা ১.৩০। গন্তবে এসে সিএনজি ছেড়ে দিয়ে অতিথি হিসাবে শ্যালিকার গৃহ প্রবেশ। 


দুপুরে খেয়ে নিয়ে লম্বা একটা ভাত-ঘুম। ভাত-ঘুম মনে হয় আমাদের মজ্জাগত ব্যাপার। দুপুরে খেয়ে নেয়ে একটু না ঘুমালে  আমাদের চলে না। ছুটির দিনে দুপুরে ভাত খেয়ে লম্বা ঘুম। অফিসে দেখেছি ডেস্কে ফাইলের স্তুুপকে বালিশ বানিয়ে কিংবা অফিসের ক্যান্টিনের টেবিলের এক কোনায় ঘুমিয়ে আছে অফিসের ম্যানেজার থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত। পদমর্যাদার কোন বালাই নেই। ডাক্তারা হয়তো বলবেন ভাত-ঘুম শরীরের জন্য ভালো না। কিন্তুুু নিজেরা সুযোগ পেলে একটু ঘুমিয়ে নিতে ভুলেন না। আমিও ভাত-ঘুম প্রেমিকদের দলে। ভাত খেয়ে একটু গড়াগড়ি না করলে শরীরটাই ম্যাজ ম্যাজ করে। 

শ্যালিকাকে আগেই জানিয়ে ছিলাম যে, বিকেলটা কাটাতে চাই নদীর পাড়ে কোন রেস্তোরায়। নদীর হাওয়া আর সেই সাথে পেট-পূজা দুটোই চলবে। বাসা থেকে বের হলাম। খান ভবনের সামনেই মেইন রোড। মুন্সিগন্জ সদররোড। একটা অটো ঠিক করলাম। ভাড়া ১৫০ টাকা। গন্তব্য চর কিশোরগন্জ। মুন্সিগন্জে অটোই প্রধান বাহন । পিছনে  দুটো সিট মুখোমুখি , মাঝখানে পা রাখার জায়গা । ড্রাইভারের সীটের দুপাশে অনায়েসে দুজন বসতে পারে।  বিকেল ৫ টা । পড়ন্ত বিকেলে রাস্তায় মানুষের আনা গোনা। কিছুক্ষণ পর শহর পিছনে পড়ে রইলো । রাস্তার এক পাশে ক্ষেত খামার,ডোবা-পুকুর। মানুষের বসতবাড়ি। শেষ  বিকেলের আলোয় পরিবেশটা বেশ মায়াময় লাগছে। চারিদিকে গ্রামীণ পরিবেশ। বেশ কয়েকটি ছোট ব্রীজ পার হলাম। মেঘনার তীরে এই জায়গাটার নাম চর কিশোরগন্জ। নদীর ওপারে গজারিয়া ঘাট। তীরের এক পাশে পানিতে  কম গভীরতায় খুটি গেড়ে উঠেছে গোটা চারেক রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টগুলোর প্যার্টাণ একই রকম। পাড় থেকে  রেস্টুরেন্ট-এ ঢুকতে হলে কাঠের পাটাতন ব্যবহার করতে হয়। প্রত্যেকটা রেস্টুরেন্টের প্রবেশ পথ  বেশ সুন্দর করে সজ্জিত।কৃত্রিম ফুল ও আলোকসজ্জা বেশ একটা মনোহর পরিবেশ তৈরী করেছে। শেষ বিকেল। রেস্টুরেন্টের আলো প্রতিফলিত হয়েছে নদীর কালো জলে। বেছে বেছে  একটা রেস্টুরেন্ট-এ প্রবেশ করলাম। ঢোকার মুখেই দেখা গেলো অনেকেই সেলফি তুলছে। সেলফি তুলতেই তো অনেকে এত খরচ করে এখানে আসে। ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিতে হবে না! আত্মীয়স্বজন,বন্ধু-বান্ধব এদেরকে একটু জেলাস ফিল করাতে হবে না। আর যদি কোন মেয়ের সদয় দৃষ্টি আর্কষিত হয়,তাহলে তো কথাই নেই।  ফেইসবুকের কোথায় যেন দেখেছিলাম একটি  ডায়লগ : ‘ চৌদ্দরী সাহেব !  আমি গরীব হতে পারি, কিন্তুু ফেইসবুকে আমার একটা স্টেটাস আছে’। 

রেস্টুরেন্টের ভিতরটা বেশ গোছালো। আমরা আসন গ্রহন করার পর ওয়েটার মেনূ কার্ড ধরিয়ে দিলো । বেশীর ভাগই ফাষ্টফুড জাতীয় খাদ্য। বার্গার, ফ্রাইড চিকেন, ফ্রেন্চ ফ্রাই ।  চাইনিজ আইটেমও আছে। আমি বার্গার অর্ডার দিলাম। রেস্টুরেন্টের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখছিলাম দুটো সাদা লন্চ মেঘনার পানি কেটে এগিয়ে চলছে । মনে হলো যেন দুটো সাদা রাজহংস মনের আনন্দে সাঁতার কাটছে। পানির ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে রেস্টুরেন্টের নীচের খুটিতে । পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। একটু একটু করে কাঁপছে কাঠের পাটাতন । রেস্টুরেন্টের জানালা দিয়ে আসছে সতেজ বাতাস। বাইরে ধীরে ধীরে রাতের চাদরে ঢাকা পড়ছে চরাচর। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ। এবার ফেরার পালা । ভাড়া করা সিএনজি রাতের অন্ধকার কেটে এগিয়ে চললো মুন্সিগন্জ শহরের দিকে। পিছনে পড়ে রইলো  ক্ষনিকের ভালো লাগা নদীর তট, মৃদৃ মন্দ হাওয়া আর নদীর উপর ভেসে থাকা সন্ধ্যারও মেঘমালা।




ইলিশ খেতে মাওয়া

ইলিশ খেতে মাওয়া যেতে হবে কেন?-পাঠক এ প্রশ্ন তুলতেই পারেন। আসলেই তো ইলিশ মাছ খেতে কেনো মাওয়া ঘাটে যেতে হবে ! যখন আমাদের নাকের ডগার সামনেই  বিস্তর ইলিশ মাছ তাদের চকচকে দেহ নিয়ে শুয়ে আছে। দামও বেশ সস্তা। কেজি মাত্র ৭০০ টাকা। একটু মূলোমুলি করলে হযতো   ৬৫০ টাকায়   ঠেকতে পারে। কেটে ধুয়ে মশলা মেখে সরিষাতেলে কড়া ভেজে নিলেই হলো। সাথে যদি বেগুন ভাজা আর সাথে শুকনো মরিচ ভাজা-তাহলে তো কথাই নেই। চেটে-পুটে খেয়ে  দুপুরে ভাত-ঘুম। আহ! জীবন কতো সুন্দর। ইলিশ মাছ আর বাঙালী-দুজনে দুজনার।  

ইদানিং একটা হুজুগ চলছে। হুজুগটির নাম ‘আউটিং’। অনেকেরই  সপ্তাহের শুরু থেকেই মনটা উড়ু উড়ু করে । কাজে  তেমন মন বসে না। পকেটে মাল তেমন নেই-তাতে কি হয়েছে, ক্রেডিট কাড আছে না! ধার করে হলেও ঘি খাওয়া আমাদের অভ্যাস। চলে যাই মাওয়া অথবা ঢাকার পাশে গাজীপুরের কোন রিসোর্টে । যাক না কিছু টাকা খসে। সরকারী-বেসকারী ব্যাংকের লোকেরা তো ধার দেওয়া জন্য বসেই আছে। 

 বউ অনেকদিন থেকে ঘ্যানর ঘ্যানর করছে মাওয়া যাবার জন্য। মাওয়া যেয়ে  ইলিশ খাবে। সবাই নাকি মাওয়া যেয়ে ইলিশ খাচেছ মচমচ করে। আমি কৌশলে এড়িয়ে যাই ।  কিন্তুু শেষ রক্ষা আর হলো না। যেতেই হলো। গত ১৬ই ডিসেম্বর ২০২০ বউ,বাল-বাচ্চা, শ্যালিকা, শ্যালিকার  অধাংগ ও তাদের এক বছর বয়সী পূঁচকে মেয়ে সহ রওনা হলাম ।  সাথে লোক বেশী বলে প্রাইভেট গাড়ী নেওয়া গেলো না। মিরপুর ১২ নং থেকে স্বাধীন নামক বাসে শওয়ার হলাম  সকাল দ’শটার দিকে। বিজয় দিবস বলে রাস্তা-ঘাট বেশ ফাঁকা। ছোট ছোট পতাকা দিয়ে সজ্জিত দালান,দোকান ঘাট,তোরণ। বাতাসে হাল্কা শীতের আমেজ। বাস বিভিন্ন স্টপেজে থামছে আর যাত্রী তুলছে। বিরক্তির একশেষ! 

নকশী কাঁথার গ্রামে

খন গ্রামে ঢুকলাম তখন দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বাতাসে শীতল আমেজ। গ্রামের নাম জয়নগর। নামে জয়নগর হলেও গ্রামটিকে এখনও নগর-সভ্যতা পুরোপুরি গ্রাস করেনি। গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে।বেশিরভাই টিনের ঘর। কিছু কিছু একতলা পাকা বাড়ি চোখে পড়ে। গ্রামের বুক চিরে চলে গেছে একমাত্র পাকা সড়ক। সড়কটি বেশ উঁচু। মাসখানেক আগে বন্যায় যখন পুরো গ্রামটি প্লাবিত হয়,তখন অনেকে আশ্রয় নেয় এখানে। এখন পানি নেমে গেছে। সড়কে দাড়ালে অনেকদুরে যে বিলটি দেখা যায়, তার নাম হাশরা বিল। সেখানে এখনও কোমর-পানি। আমার বাড়িটি সড়ক থেকে একটু নীচে। সড়ক থেকে একটা মাটির সরু রাস্তা ঢালু হয়ে চলে গেছে বাড়ির দিকে। বাড়ির  পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে খোলা। দক্ষিণে একটা ছোট পুকুর। পুকুরের পাশেই পারিবারিক কবরস্থান। ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এখানে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন আমার বাবা,মা,দাদা ও দাদি। কবরস্থানের ভিতর একটা জঁবা ফুলের গাছ। লাল ফুল ফুঁটে আছে।  পুকুর পাড়ে দাড়ালে চোখের সামনে অবারিত ধান-ক্ষেত। পুকুর পাড়ে দাড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলাম। ঠান্ডা বাতাস যেন পরম মমতায় মুছে দিলো ভ্রমণ-ক্লান্তি। 

 


 

বাড়ির উত্তর ও পশ্চিম পাশে বেশ কয়েকটা গৃহস্থ-বাড়ি। আমার প্রতিবেশী। দাদার আমল থেকেই তারা এখানে বসবাস করছে। খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে হাটতে বের হলাম। বাড়ীর সামনে পূর্ব প্রান্তে আরেকটা পুকুর। মাছ চাষ হয়। পুকুর পাড়ে সুপারী গাছের নীচে বাঁশের দুটি মাঁচা। এক মাঁচায় বসে নিবিষ্ট মনে কাঁথা সেলাই করছে উকিয়া বেগম। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। লাল কাপড়ের জমিনে ফুঁটিয়ে চলছে দৃষ্টিনন্দন নক্শা।

নক্শী কাঁথা আমাদের প্রাচীণ লোকশিল্প। ‘নক্শী কাঁথা’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয় পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের ‘নক্শী কাঁথার মাঠ’ (১৯২৯) কাব্য থেকে। কথা প্রসংগে উকিয়া বেগম জানালো একটি কাঁথা সেলাই করে ৫৫০ টাকা পায় সে। একেকটা কাঁথা সেলাই করতে সময় লাগে তিন থেকে ছয় মাসের মতো। কোন কোন সময় নক্শা জটিল হলে সময় লাগে আরো বেশী। কাপড় ও সূতার জোগান দেয় মূলত শহুরে ব্যবসায়ীরা তাছাড়া অনেক এন.জি.ও এই কর্মকান্ডের সাথে জড়িত।  এই শহুরে ব্যবসায়ীরা এবং  এন.জি.ও গ্রাম্য নারীদের মাধ্যমে কম খরচে কাঁথা সেলাই করে শহরে নিয়ে আসে। শহরের বড় বড় মার্কেটে-এর শোভা পায় এই সব নক্শী কাঁথা এবং চাদর। ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় প্রথমেই থাকে এই নক্শী কাঁথা। উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় একেকটা কাঁথা । এক সময় গ্রাম্য নারীদের হাতে বোনা নক্শী কাঁথা শোভা পায় বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত কারোও অন্দরমহলে কাঁথা বা চাদর হিসাবে।  ইউরোপের কোন শহরে সৌখিন নাগরিকের বাসগৃহের ড্রইং রুমে কাঁচের ফ্রেমে ও শোভা পায় এই কাঁথা। 



গ্রামের নারীরা সাধারণত অবসর সময়ে ঘরের কাজ শেষ করে বিকেলের দিকে কাঁথা সেলাই করতে বসে। অনেক সময় অন্যান্য মহিলাদের সাথে গল্প-গজব করতে করতে কাঁথা সেলাই করতে দেখা যায়। কাঁথা কেনার আগ্রহের কথা জানাতেই  উকিয়া আরেক মহিলাকে ডেকে আনলো। মহিলাটি ঘর থেকে একটি ভাঁজ করা কাঁথা আনলো। আমাকে ভালো করে দেখার জন্য বেশ কয়েকজন মিলে আমার সামনে কাঁথাটি মেলে ধরলো। এক কথায় অপূর্ব। সূক্ষ সূতার কাজ। অনবদ্য শৈলী। পাঠকরা ছবি দেখলেই এই কাঁথার সৌন্দর্য সর্ম্পকে একটু ধারনা পেতে পারবেন। অবাক দৃষ্টিতে অনেকক্ষন তাকিয়ে রইলাম কাঁথাটির জমিনের দিকে। চোখ ফেরানো দায়। 




একটু দরদাম করতে হলো। অবশেষে ১৫০০ টাকায় রফা হলো। এতো অল্পমূল্যে অসাধারণ একটা শিল্পকর্ম কিনতে পেরে মনটা ভালো হয়ে গেলো। আমার কাছে ১৫০০ টাকা হয়তো কিছুই না, কিন্তুু এই গ্রাম্য মহিলার কাছে এই করোনা কালে এই টাকাই অনেককিছু। গ্রাম্য মহিলাটি যে খুশি,সেটি তার চোখ মুখ দেখলেই পরিষ্কার বোঝা গেলো। পরিশ্রমের উপযুক্ত মুল্য পেলে সকলেই খুশি হয়। রাতে আরও কয়েকজন মহিলা তাদের সেলাই করা কাঁথা নিয়ে আসলো। সাধ্যমতো তিনটা কিনলাম। কেনা-কাটায় যে এতো সুখ তা অনেকদিন পর আবার টের পেলাম।

নক্শী কাঁথা  আমাদের গর্ব। সরকার এবং আমাদের সকলকে সচেষ্ট হতে হবে এই গ্রামীণ শিল্পকে রক্ষা করার জন্য। খেয়াল রাখতে হবে এই নক্শী-কাঁথা বুননের পিছনে যে গ্রাম্য নারীর নিরলস পরিশ্রম, মেধা ও মনন জড়িত আছে, সে যেনো  উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও স্বীকৃতি পায়।





Share