নকশী কাঁথার গ্রামে

খন গ্রামে ঢুকলাম তখন দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বাতাসে শীতল আমেজ। গ্রামের নাম জয়নগর। নামে জয়নগর হলেও গ্রামটিকে এখনও নগর-সভ্যতা পুরোপুরি গ্রাস করেনি। গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে।বেশিরভাই টিনের ঘর। কিছু কিছু একতলা পাকা বাড়ি চোখে পড়ে। গ্রামের বুক চিরে চলে গেছে একমাত্র পাকা সড়ক। সড়কটি বেশ উঁচু। মাসখানেক আগে বন্যায় যখন পুরো গ্রামটি প্লাবিত হয়,তখন অনেকে আশ্রয় নেয় এখানে। এখন পানি নেমে গেছে। সড়কে দাড়ালে অনেকদুরে যে বিলটি দেখা যায়, তার নাম হাশরা বিল। সেখানে এখনও কোমর-পানি। আমার বাড়িটি সড়ক থেকে একটু নীচে। সড়ক থেকে একটা মাটির সরু রাস্তা ঢালু হয়ে চলে গেছে বাড়ির দিকে। বাড়ির  পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে খোলা। দক্ষিণে একটা ছোট পুকুর। পুকুরের পাশেই পারিবারিক কবরস্থান। ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এখানে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন আমার বাবা,মা,দাদা ও দাদি। কবরস্থানের ভিতর একটা জঁবা ফুলের গাছ। লাল ফুল ফুঁটে আছে।  পুকুর পাড়ে দাড়ালে চোখের সামনে অবারিত ধান-ক্ষেত। পুকুর পাড়ে দাড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলাম। ঠান্ডা বাতাস যেন পরম মমতায় মুছে দিলো ভ্রমণ-ক্লান্তি। 

 


 

বাড়ির উত্তর ও পশ্চিম পাশে বেশ কয়েকটা গৃহস্থ-বাড়ি। আমার প্রতিবেশী। দাদার আমল থেকেই তারা এখানে বসবাস করছে। খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে হাটতে বের হলাম। বাড়ীর সামনে পূর্ব প্রান্তে আরেকটা পুকুর। মাছ চাষ হয়। পুকুর পাড়ে সুপারী গাছের নীচে বাঁশের দুটি মাঁচা। এক মাঁচায় বসে নিবিষ্ট মনে কাঁথা সেলাই করছে উকিয়া বেগম। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। লাল কাপড়ের জমিনে ফুঁটিয়ে চলছে দৃষ্টিনন্দন নক্শা।

নক্শী কাঁথা আমাদের প্রাচীণ লোকশিল্প। ‘নক্শী কাঁথা’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয় পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের ‘নক্শী কাঁথার মাঠ’ (১৯২৯) কাব্য থেকে। কথা প্রসংগে উকিয়া বেগম জানালো একটি কাঁথা সেলাই করে ৫৫০ টাকা পায় সে। একেকটা কাঁথা সেলাই করতে সময় লাগে তিন থেকে ছয় মাসের মতো। কোন কোন সময় নক্শা জটিল হলে সময় লাগে আরো বেশী। কাপড় ও সূতার জোগান দেয় মূলত শহুরে ব্যবসায়ীরা তাছাড়া অনেক এন.জি.ও এই কর্মকান্ডের সাথে জড়িত।  এই শহুরে ব্যবসায়ীরা এবং  এন.জি.ও গ্রাম্য নারীদের মাধ্যমে কম খরচে কাঁথা সেলাই করে শহরে নিয়ে আসে। শহরের বড় বড় মার্কেটে-এর শোভা পায় এই সব নক্শী কাঁথা এবং চাদর। ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় প্রথমেই থাকে এই নক্শী কাঁথা। উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় একেকটা কাঁথা । এক সময় গ্রাম্য নারীদের হাতে বোনা নক্শী কাঁথা শোভা পায় বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত কারোও অন্দরমহলে কাঁথা বা চাদর হিসাবে।  ইউরোপের কোন শহরে সৌখিন নাগরিকের বাসগৃহের ড্রইং রুমে কাঁচের ফ্রেমে ও শোভা পায় এই কাঁথা। 



গ্রামের নারীরা সাধারণত অবসর সময়ে ঘরের কাজ শেষ করে বিকেলের দিকে কাঁথা সেলাই করতে বসে। অনেক সময় অন্যান্য মহিলাদের সাথে গল্প-গজব করতে করতে কাঁথা সেলাই করতে দেখা যায়। কাঁথা কেনার আগ্রহের কথা জানাতেই  উকিয়া আরেক মহিলাকে ডেকে আনলো। মহিলাটি ঘর থেকে একটি ভাঁজ করা কাঁথা আনলো। আমাকে ভালো করে দেখার জন্য বেশ কয়েকজন মিলে আমার সামনে কাঁথাটি মেলে ধরলো। এক কথায় অপূর্ব। সূক্ষ সূতার কাজ। অনবদ্য শৈলী। পাঠকরা ছবি দেখলেই এই কাঁথার সৌন্দর্য সর্ম্পকে একটু ধারনা পেতে পারবেন। অবাক দৃষ্টিতে অনেকক্ষন তাকিয়ে রইলাম কাঁথাটির জমিনের দিকে। চোখ ফেরানো দায়। 




একটু দরদাম করতে হলো। অবশেষে ১৫০০ টাকায় রফা হলো। এতো অল্পমূল্যে অসাধারণ একটা শিল্পকর্ম কিনতে পেরে মনটা ভালো হয়ে গেলো। আমার কাছে ১৫০০ টাকা হয়তো কিছুই না, কিন্তুু এই গ্রাম্য মহিলার কাছে এই করোনা কালে এই টাকাই অনেককিছু। গ্রাম্য মহিলাটি যে খুশি,সেটি তার চোখ মুখ দেখলেই পরিষ্কার বোঝা গেলো। পরিশ্রমের উপযুক্ত মুল্য পেলে সকলেই খুশি হয়। রাতে আরও কয়েকজন মহিলা তাদের সেলাই করা কাঁথা নিয়ে আসলো। সাধ্যমতো তিনটা কিনলাম। কেনা-কাটায় যে এতো সুখ তা অনেকদিন পর আবার টের পেলাম।

নক্শী কাঁথা  আমাদের গর্ব। সরকার এবং আমাদের সকলকে সচেষ্ট হতে হবে এই গ্রামীণ শিল্পকে রক্ষা করার জন্য। খেয়াল রাখতে হবে এই নক্শী-কাঁথা বুননের পিছনে যে গ্রাম্য নারীর নিরলস পরিশ্রম, মেধা ও মনন জড়িত আছে, সে যেনো  উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও স্বীকৃতি পায়।





0 Response to "নকশী কাঁথার গ্রামে"

Post a Comment